Version:1.0 StartHTML:0000000156 EndHTML:0000407367 StartFragment:0000000469 EndFragment:0000407359
বাংলাদেশের শিল্প ও উদ্যোক্তা ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাঁরা কেবল ব্যবসা গড়ে তোলেননি, বরং একটি জাতির আত্মবিশ্বাসকেও নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তাঁদের অন্যতম হলেন স্যামসন এইচ চৌধুরী। তাঁর জীবনগল্প প্রমাণ করে যে, স্বপ্ন, সততা এবং কঠোর পরিশ্রম থাকলে একটি ছোট্ট গ্রামের ডিসপেনসারি থেকেও বিশ্বজয় করা সম্ভব।
প্রায় সাড়ে সাত দশক আগে পাবনার আতাইকুলা গ্রামের এক ছোট্ট ওষুধের দোকান ‘ইকোনমি ফার্মেসি’ দিয়েই শুরু হয়েছিল তাঁর যাত্রা। বাবার দেওয়া সামান্য কিছু পুঁজি আর এক বুক স্বপ্ন নিয়ে তিনি মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। গ্রামের মানুষের চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা তাঁকে ভাবিয়ে তুলেছিল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, কেবল ওষুধ বিক্রি করে নয়, দেশের মাটিতেই বিশ্বমানের ওষুধ উৎপাদনের মাধ্যমে মানুষের জীবনে প্রকৃত পরিবর্তন আনা সম্ভব। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য তিনি পাশে পান তাঁর তিন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ডা. কাজী হারুনার রশিদ, পি. কে. সাহা এবং রাধেশ্যাম রায়কে। ১৯৫৮ সালে চার বন্ধু মিলে প্রতিষ্ঠা করেন Square Pharmaceuticals PLC। চারজনের সমান অংশীদারিত্ব ও পারস্পরিক বিশ্বাসের প্রতীক হিসেবেই প্রতিষ্ঠানটির নাম রাখা হয় ‘স্কয়ার’। পাবনার একটি ছোট্ট ভাড়া করা ঘর থেকে শুরু হওয়া সেই যাত্রাই আজ বিশ্বের অন্যতম সফল ফার্মাসিউটিক্যাল ব্র্যান্ডের গল্প। স্যামসন এইচ চৌধুরীর ব্যবসায়িক দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল একটি বিষয়—মানের সঙ্গে কোনো আপস নয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, “ওষুধ মানুষের জীবন বাঁচায়, তাই এর গুণগত মানের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না।” তাঁর এই নীতির কারণেই অল্প সময়ের মধ্যে চিকিৎসক ও সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করে স্কয়ার। ১৯৮৫ সালে স্কয়ার বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পে শীর্ষস্থান অর্জন করে এবং দীর্ঘদিন ধরে সেই অবস্থান ধরে রেখেছে। তবে তাঁর স্বপ্নের পরিধি ছিল আরও বড়। ২০০২ সালে তাঁর নেতৃত্বেই স্কয়ার প্রথম বাংলাদেশি ওষুধ কোম্পানি হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে ওষুধ রপ্তানি শুরু করে। আজ বিশ্বের বহু দেশে “Made in Bangladesh” লেখা স্কয়ারের ওষুধ মানুষের জীবন বাঁচাচ্ছে।
ফার্মাসিউটিক্যালসের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন এক বিশাল বহুমাত্রিক শিল্পসাম্রাজ্য। Square Consumer Products Limited-এর মাধ্যমে এসেছে ‘রাধুনী’ ও ‘রুচি’র মতো জনপ্রিয় ব্র্যান্ড। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে Square Textiles PLC, দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল স্যাটেলাইট চ্যানেল মাছরাঙা টেলিভিশন এবং আন্তর্জাতিক মানের Square Hospitals Limited।
আজ স্কয়ার পরিবারে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু স্যামসন এইচ চৌধুরীর সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তাঁর মানবিকতা। তিনি নিজেকে কখনো মালিক হিসেবে দেখেননি; বরং একটি পরিবারের অভিভাবক হিসেবে ভাবতেন। শ্রমিকদের কল্যাণ, ন্যায্য অধিকার এবং মানবিক মূল্যবোধ ছিল তাঁর নেতৃত্বের মূল শক্তি। তিনি ছিলেন দেশের অন্যতম সৎ করদাতা এবং বিশ্বাস করতেন, ব্যবসা কেবল মুনাফার জন্য নয়; এটি সমাজ ও মানুষের জীবন পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া সততা, সুশাসন এবং মানবিক ব্যবসায়িক দর্শন আজও স্কয়ার গ্রুপকে পথ দেখিয়ে যাচ্ছে। স্যামসন এইচ চৌধুরীর জীবন আমাদের শেখায় জন্মস্থান বা আর্থিক সীমাবদ্ধতা কখনো সাফল্যের পথে বাধা নয়। যদি থাকে স্বপ্ন দেখার সাহস, মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং অদম্য পরিশ্রমের মানসিকতা, তবে একটি ছোট্ট গ্রামের ডিসপেনসারি থেকেও বিশ্বজয়ের ইতিহাস লেখা সম্ভব ।