Version:1.0 StartHTML:0000000156 EndHTML:0000363294 StartFragment:0000000469 EndFragment:0000363286
আমাদের সমাজে নারীদের প্রায়ই একটি নির্দিষ্ট পরিচয়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সেই সব সীমারেখা ভেঙে একাধারে কবি, শিক্ষাবিদ, উদ্যোক্তা, শিল্পনেতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন ড. রুবানা হক। তিনি শুধু বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের প্রথম নারী নেতা নন, বরং তিনি এমন এক ব্যক্তিত্ব, যিনি প্রমাণ করেছেন যে স্বপ্ন, মেধা এবং আত্মবিশ্বাস থাকলে একজন নারী একই সঙ্গে বহু পরিচয়ের আলোয় উজ্জ্বল হতে পারেন।
১৯৬৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করা রুবানা হকের জীবনের শুরুটা ছিল জ্ঞানচর্চা ও সাহিত্যকে ঘিরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর ইংরেজি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর তিনি শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন। শ্রেণিকক্ষের সেই দিনগুলো তাঁকে শিখিয়েছিল মানুষের মন বুঝতে, নতুন প্রজন্মের স্বপ্নকে ধারণ করতে এবং সমাজকে ভিন্ন চোখে দেখতে। শিক্ষকতার পাশাপাশি তাঁর হৃদয়ে ছিল সাহিত্যের গভীর টান। তিনি একজন স্বনামধন্য কবি, যার লেখায় উঠে এসেছে জীবন, ভালোবাসা এবং সামাজিক বাস্তবতার নানা অনুষঙ্গ। তাঁর কাব্যগ্রন্থ Time of My Life পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করে। পরবর্তীতে তিনি ভারতের ঐতিহ্যবাহী যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। সাহিত্য ও শিক্ষা তাঁকে গড়ে তুলেছে একজন মানবিক ও সংবেদনশীল নেতা হিসেবে।
ব্যবসার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয় প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক-এর সহধর্মিণী হিসেবে। কিন্তু ২০১৭ সালে আনিসুল হকের আকস্মিক প্রয়াণ তাঁর জীবনে এক কঠিন অধ্যায়ের সূচনা করে। ব্যক্তিগত শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে তিনি Mohammadi Group-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান ও ব্যবসার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার কঠিন চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করেন।
২০১৯ সালে তিনি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি-এর সভাপতি নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। সংগঠনটির চার দশকেরও বেশি ইতিহাসে তিনিই ছিলেন প্রথম নারী সভাপতি। বিশেষ করে করোনা মহামারির সময়ে বিশ্ব ক্রেতাদের সঙ্গে দরকষাকষি, শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা এবং শিল্পকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে তাঁর সাহসী নেতৃত্ব আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়। ব্যবসার ব্যস্ততার মধ্যেও তাঁর ভেতরের শিক্ষক সত্তা কখনো হারিয়ে যায়নি। ২০২২ সালে তিনি Asian University for Women-এর উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সুবিধাবঞ্চিত ও সংগ্রামী নারীদের উচ্চশিক্ষার এই প্রতিষ্ঠানকে তিনি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও অনুপ্রেরণায় সমৃদ্ধ করছেন। তার বহুমাত্রিক অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি BBC-এর বিশ্বের ১০০ জন অনুপ্রেরণাদায়ী নারীর তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন।
ড. রুবানা হক প্রমাণ করেছেন, কোনো পরিচয়ই একজন মানুষকে সীমাবদ্ধ করে রাখতে পারে না। একজন নারী একই সঙ্গে কবি, শিক্ষাবিদ, শিল্পনেতা এবং সমাজ পরিবর্তনের অগ্রদূত হতে পারেন। তিনি আজ কোটি তরুণীর কাছে সাহস, স্বপ্ন এবং সম্ভাবনার এক জীবন্ত প্রতীক যিনি শেখান, আত্মবিশ্বাস আর অধ্যবসায় থাকলে আকাশও সীমা নয় ।